ঢাকা
৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৯:৩১
প্রকাশিত : এপ্রিল ৩, ২০২৬
আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০২৬
প্রকাশিত : এপ্রিল ৩, ২০২৬

প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন মায়ানমারের জান্তা প্রধান, পোশাক বদলালেও কি ক্ষমতা বদলাবে?

মায়ানমারের সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইং এখন দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন তিনি। এরপর দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যায়। ওই সময় তিনি এক বছরের মধ্যে নির্বাচন করে বেসামরিক সরকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে তার পাঁচ বছর লেগে গেল।

আজ নবনির্বাচিত সংসদ মিন অং হ্লাইংকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে সংবিধান অনুযায়ী তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নামেই বেসামরিক শাসন।

অভ্যুত্থানের পর প্রথমবার বসা এই সংসদের বেশিরভাগ সদস্যই তার অনুগত। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। বাকি আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ জিতেছে সেনাবাহিনী সমর্থিত দল ইউএসডিপি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে আগে থেকেই নির্ধারিত ফলাফলের মতো মনে হচ্ছে।

নতুন সরকার গঠনের পরও সেখানে সামরিক ব্যক্তিদের প্রভাব বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিন অং হ্লাইং ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছেন, তার ঘনিষ্ঠ মিত্র কট্টরপন্থী জেনারেল ইয়ে উইন উ নতুন সেনাপ্রধান হবেন। তিনি কঠোর অভিযানের জন্য পরিচিত। পাশাপাশি মিন অং হ্লাইং একটি পরামর্শক পরিষদ গঠন করেছেন। সেই  পরিষদের হাতে বেসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ক্ষমতা থাকবে।

এতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি সেনাবাহিনীর পোশাক ছেড়েও বাস্তবে ক্ষমতা ধরে রাখবেন।

মিন অং হ্লাইংয়ের অভ্যুত্থানের পর গত পাঁচ বছর মায়ানমারের জন্য খুব কঠিন সময় গেছে। ২০২০ সালের নির্বাচনে অং সান সু চি ও তার দল বড় জয় পাওয়ার পর সংসদ তাদের আবার ক্ষমতায় বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় মিন অং হ্লাইং সেনাবাহিনী নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। এতে সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হলে সেনাবাহিনী তা দমন করতে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করে। এতে পরিস্থিতি দ্রুত গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে সামরিক সরকার দেশের বড় অংশ সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে হারিয়েছে। এর জবাবে সেনাবাহিনী বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা গ্রামগুলোতে নির্বিচারে বিমান হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় স্কুল, বাড়িঘর ও হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় সামরিক জান্তা গত দুই বছরে হারানো কিছু এলাকা আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে।

মায়ানমারের তরুণ আন্দোলনকারী কিয়াও উইন (ছদ্মনাম) মনে করেন, দেশে দ্রুত পরিবর্তনের আশা এখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ছাত্রাবস্থায় ২০২২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পর এক সপ্তাহ ধরে তাকে নির্যাতন করা হয় এবং পরে কারাগারে পাঠানো হয়। সম্প্রতি তিনি মুক্তি পেয়েছেন।

তাকে লোহার রড দিয়ে মারধর করা হয়, সিগারেট দিয়ে শরীর পোড়ানো হয় এবং ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয় বলে তিনি দাবি করেছেন। এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় কী তথ্য চাওয়া হচ্ছিল, সেটিও স্পষ্ট ছিল না বলে তিনি জানান।

রাজধানী নেপিডোতে সেনাবাহিনীর বার্ষিক কুচকাওয়াজে মিন অং হ্লাইং যখন ভাষণ দেন, তখন অনেকেই আশা করেছিলেন তিনি অভ্যুত্থানের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করবেন। কিন্তু তার ভাষণে এমন কোনো ইঙ্গিত ছিল না। বরং তিনি আগের মতোই দাবি করেন, সেনাবাহিনীর ‘জাতীয় রাজনীতিতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার’ সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে এবং তারাই নাকি বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষা করেছে।

সামরিক সরকার এখনও দাবি করে, তাদের বিরোধীরা বিদেশি শক্তির সমর্থিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে দেশের সংঘাতের বাস্তবতা বদলাবে না। সংঘাত নিয়ে তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা এসিএলইডি–এর সিনিয়র বিশ্লেষক সু মন বলেন, মায়ানমারের সংঘাতের পরিস্থিতি মূলত আগের মতোই থাকবে।

নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ে উইন উ মিন অং হ্লাইংয়ের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আগের নীতিই অনুসরণ করবেন এবং বিদ্রোহীদের কাছে হারানো অঞ্চল পুনর্দখলই হবে তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো প্রায় ৯০টি শহর নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে এসব এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর আরো বিমান ও ড্রোন হামলা এবং পোড়ামাটি নীতি চালানোর আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া প্রশাসনের প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় ঐক্য সরকারও (এনইউজি) তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি। থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা নতুন সরকার ও সাম্প্রতিক নির্বাচনকে অবৈধ বলে মনে করে এবং সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে একটি নতুন ফেডারেল সংবিধান গঠনের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে।

এনইউজি-এর মুখপাত্র নে ফোন লাট বলেন, এখন আপোস করার সময় নয়। সেনাবাহিনী তাদের লক্ষ্য মেনে না নিলেও বিপ্লব চলবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখন আন্দোলন থামিয়ে দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বেশি কষ্ট পেতে হবে।

এদিকে মিন অং হ্লাইংয়ের অভ্যুত্থান মায়ানমারের অর্থনীতিতেও বড় আঘাত হেনেছে। জাতিসংঘের হিসাবে বর্তমানে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা দরকার। যুদ্ধের কারণে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তীব্র মুদ্রাস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবেও জ্বালানি সংকট বেড়েছে। মায়ানমার তার তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে, যার বেশিরভাগই আসে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে। কিন্তু এখন এসব দেশ রপ্তানি সীমিত করায় পেট্রোল ও ডিজেল রেশনিং করতে হচ্ছে এবং দামও দ্রুত বাড়ছে।

ইয়াঙ্গুনের হ্লাইং থারয়ার শিল্পাঞ্চলের মোটরবাইক ট্যাক্সিচালক টিন উ বলেন, এখনকার পরিস্থিতি দশ বছর আগের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। আয় দিয়ে বাড়িভাড়া ও খাবারের খরচও ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। নতুন সরকারের ওপর তার তেমন আস্থা নেই বলেও জানান তিনি। জ্বালানি সংকটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় সমস্যায় পড়েছে। ইয়াঙ্গুনের বেশিরভাগ এলাকায় দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে, তাই অনেক কারখানা জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল।

এই সংকটের মধ্যে প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী মায়া আয়ে এক ভিন্ন মত তুলে ধরেছেন। বহু বছর সামরিক কারাগারে কাটানো এই নেতা মনে করেন, সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হলো সেনাবাহিনী ও বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা। তিনি সংলাপ ও সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির দাবি জানিয়ে একটি নতুন পরিষদ গঠন করেছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচন কোনো সমাধান নয়। বর্তমান সংবিধান দিয়েও পরিস্থিতি এগোবে না। 

তিনি সতর্ক করে বলেন, মানুষ এই দীর্ঘ সংকটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং কোনো সমাধান না মিললে দেশ ভেঙে পড়তে পারে। মায়া আয়ে মনে করেন, কারাবন্দি গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি মুক্তি পেলে তিনি একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। গুঞ্জন রয়েছে, মিন অং হ্লাইং এ বছর কোনো এক সময় তাকে মুক্তি দিতে পারেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মায়ানমারে শান্তির পথ থাকলেও তা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং আপাতত সামরিক শাসকেরা সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।

সর্বশেষ
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮, মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1736 786915, +880 1300 126 624, ইমেইল: online.bdsangbad@gmail.com (online)
news@bd-sangbad.com, ads@bd-sangbad.com
বাংলাদেশ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।  অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram