

৪ মে, বিকেল চারটা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশের সফররত সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। এতে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল এবং বাংলাদেশ–মিয়ানমার ডেস্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত জয়েন্ট সেক্রেটারি বি. শ্যাম।
বৈঠকের একটি বিশেষ দিক ছিল— সেখানে কোনো মোবাইল ফোন বা রেকর্ডিং ডিভাইস ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না; কেবল কাগজে-কলমে নোট নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোর ভূমিকা, পানিবণ্টন ইস্যুর সঙ্গে ভিসা ও জ্বালানি প্রসঙ্গও চলে আসে।
সম্পর্কের ‘টেস্টিং টাইম’ ও নির্বাচন প্রসঙ্গ
বিক্রম মিশ্রি বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী প্রায় দেড় বছর, অর্থাৎ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল— দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ছিল একটি “টেস্টিং টাইম”।
তিনি জানান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরও সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি নিজেও ঢাকা সফর করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে— বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভারতের সম্ভাব্য ভূমিকা প্রসঙ্গে মিশ্রি স্পষ্টভাবে বলেন, ''কোনো দেশের সরকার জনপ্রিয় হোক বা না হোক, কূটনৈতিক সম্পর্ক সেই সরকারের সঙ্গেই রাখতে হয়।''
মিশ্রির ভাষায়, “বাংলাদেশের নির্বাচন কীভাবে হয়েছে বা হবে— এটি সম্পূর্ণভাবে সে দেশের জনগণের বিষয়। এ নিয়ে কোনো ধরনের ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ ভারতের সম্পৃক্ততা রয়েছে— এমন ধারণা সঠিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, ভারত থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য নয়; তা বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্যই।
শেখ হাসিনা ইস্যুতে নীরবতা
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে কি না— এমন প্রশ্নে সরাসরি নাম উল্লেখ না করে মিশ্রি বলেন, “কোনো ব্যক্তিগত ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না।”
অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও তিস্তা প্রসঙ্গ
আলোচনায় উঠে আসে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি, যার মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। মিশ্রি জানান, চুক্তিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বিদ্যমান কাঠামোর মধ্য দিয়েই এর নবায়ন সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে, ফলে পানি খাতে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১১ সালে প্রায় চূড়ান্ত হলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এখনো চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে কি না— এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি, তবে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানান।
তিস্তা মেগা প্রকল্পে চীনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে এবং নতুন সরকার চাইলে তা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
সার্ক বনাম বিমসটেক
আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্নে বিক্রম মিশ্রি বলেন, সার্ককে কার্যকর করার জন্য অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।
তার মতে, “এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার সার্ককে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে।”
এই প্রেক্ষাপটে ভারত এখন বিমসটেককে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এই জোটের চেয়ারম্যান এবং সহযোগিতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে মিশ্রি বলেন, “বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে—এটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয় যা বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
রাজনৈতিক মন্তব্য ও কূটনীতি
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্য প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে মিশ্রি বলেন, মন্তব্যটি একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠাতে একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রায় তিন হাজার ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হলেও এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এসময় বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে ‘সাপ ও কুমির ছাড়ার’ মতো গুজবও তিনি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেন।
ভিসা ইস্যু ও জ্বালানি সহযোগিতা
বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা পুরোপুরি চালুর বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি মিশ্রি। তবে তিনি বলেন, দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে কাজ চলছে।
রাশিয়া থেকে তেল আমদানির সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মূলত পরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রয়োজন অনুভব করে। তার মতে, “বাংলাদেশকে আমরা বিদ্যমান চুক্তির আওতায় পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করছি এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।”
বৈঠকের শেষে সমাপনী বার্তায় বিক্রম মিশ্রি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশে জানান, ভারত ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ককে ধীরে, বাস্তবতাভিত্তিক এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

