

মোঃ মোশাররফ হোসেন, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: মাত্র ৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি জমি বিক্রিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় বোন ও ভাতিজাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মোস্তাক আহমেদ ওরফে আবু (৬০) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘটনার পর অভিযুক্ত মোস্তাক আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে মুরাদনগর থানা পুলিশ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার বাবুটিপাড়া ইউনিয়নের দড়ানীপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন—দড়ানীপাড়া গ্রামের মৃত মনিরুল ওরফে মনু মিয়ার মেয়ে খালেদা আক্তার ওরফে বেবি (৭০) এবং তাঁর বড় ভাই বাচ্চু মিয়ার ছেলে মঞ্জুরুল আলম ওরফে তুতু (৩৫)। সম্পর্কে তাঁরা ফুফু ও ভাতিজা। খালেদা আক্তার স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মৃত মনিরুল ওরফে মনু মিয়ার সাত ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে মোস্তাক আহমেদ ছিলেন সবার ছোট। কয়েক বছর আগে বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার খোকনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ির আশপাশে বেশ কিছু জমি কেনেন তিনি। পরিবারের দাবি, এসব জমি সাত ভাই ও এক বোনের নামে রেজিস্ট্রি করার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে মোস্তাক আহমেদ সেগুলো নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।
স্থানীয় বাসিন্দা জিল্লুর রহমান জানান, জমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একাধিকবার বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। সম্প্রতি বাড়ির পাশের একটি জমি বিক্রির উদ্যোগ নেন মোস্তাক আহমেদ। স্থানীয়দের হিসাবে ওই জমির বাজারমূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা।
জিল্লুর রহমান বলেন, জমিটি বিক্রির উদ্যোগের বিষয়টি জানতে পেরে দুই দিন আগে মঞ্জুরুল আলম ওই জমিতে একটি ব্যানার টানিয়ে দেন। জমিটি নিয়ে মামলা চলমান থাকায় কাউকে জমিটি না কেনার অনুরোধ জানানো হয়। এরপর থেকেই পারিবারিক বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
নিহত মঞ্জুরুল আলমের স্ত্রী হালিমা বেগমের অভিযোগ, সোমবার সন্ধ্যায় তিনি ঘরে কাজ করছিলেন। এ সময় খবর পান, আবু মিয়া তাঁর স্বামীকে দা দিয়ে কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে বাড়িতে ঢুকেছেন। পরে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে দেখতে পান, আবু তাঁর বোন বেবিকে কোপাচ্ছেন। স্থানীয়রা আহত দুজনকে উদ্ধার করে গৌরীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত মঞ্জুরুল আলমের মা ফরিদা বেগম বলেন, “আমার চারজন নাতি-নাতনি আছে। ছেলে ও ছেলের বউ মিলে কোনো রকমে সংসার চালাত। এখন তাদের কী হবে? আমি এই হত্যাকারীর ফাঁসি চাই।”
বাবুটিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরমান হোসেন বলেন, পরিবারটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল। প্রায় তিন মাস আগে বিষয়টি তাঁর কাছে এলে স্থানীয় মাতব্বরদের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বিরোধের মীমাংসা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মতিন বলেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে পরিবারটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা ছিল। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি।
মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে মোস্তাক আহমেদ তাঁর বোন ও ভাতিজাকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যান।
ওসি আরও বলেন, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, নিহত দুজনের মরদেহ গৌরীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।

