

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার: কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্বামী হত্যার মামলার বাদী ফাতেমা বেগম গত ৩১ আগস্ট রাত থেকে কারাগারে রয়েছেন। একটি ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় গ্রেপ্তারের পর দেড় বছরের শিশুসহ তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে গত ১ সেপ্টেম্বর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়।
একই মামলায় গ্রেপ্তার তাঁর শাশুড়ি রাশেদা বেগম ও মেয়ে নাছিমা আকতার জামিন পেয়েছেন। ফাতেমা কারাগারে যাওয়ায় তাঁর অপর দুই সন্তানকে থাকতে হচ্ছে এতিমখানায়। তারা মাকে কাছে চায়।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতার পাড়ার কবির বাজার এলাকায় কথা কাটাকাটির জেরে মোহাম্মদ কাশেমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পরদিন তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে রাসেলসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার চার নম্বর আসামি রাসেল।
কাশেম হত্যার পর রাসেলের মা নুর জাহান বেগম কাশেমের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগ করেন। আদালতে করা ওই অভিযোগে ফাতেমা, তাঁর শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর ও ননদসহ সাতজনকে আসামি করার আবেদন করা হয়।
আদালতের নির্দেশে মহেশখালী থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম অভিযোগটি তদন্ত করেন। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও মামলার কথিত সাক্ষীদের কয়েকজন। তাঁদের দাবি, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের বক্তব্য উল্লেখ করা হলেও তাঁরা দাবি করেছেন, এ মামলায় তাঁরা কোনো সাক্ষ্য দেননি এবং সাক্ষীর তালিকায় তাঁদের নাম কীভাবে এসেছে, তা তাঁরা জানেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাশেম হত্যার দিন ২৩ এপ্রিল উত্তেজিত লোকজন রাসেলের বাড়িঘরে ভাঙচুর করেছিলেন। এতে কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না। পরে প্রতিশোধমূলকভাবে কাশেমের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলা করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত করা হয়েছে। বাদীপক্ষের দেওয়া সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়ার পর তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
এই মামলায় গত ৩১ আগস্ট রাতে ফাতেমা বেগম, তাঁর শাশুড়ি রাশেদা বেগম ও বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে রাশেদা ও নাছিমা জামিন পান। তবে দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ফাতেমার শাশুড়ি রাশেদা বেগমের অভিযোগ, তাঁদের ছেলে হত্যার পর উল্টো তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলার বিষয়টি তাঁরা আগে জানতে পারেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
ফাতেমার দুই মেয়ে রাজমিন আকতার ও মিশকাত জান্নাত বর্তমানে কুতুবজোমের একটি এতিমখানায় রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, মাকে কাছে না পেয়ে শিশু দুটি কান্নাকাটি করছে।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক বলেন, ২৪ মে ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাঁর দাবি, কাশেম হত্যার পর পরিবারটিকে চাপে ফেলতেই মামলাটি করা হয়েছে।
তবে ইউপি চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, কাশেম হত্যার পর উত্তেজিত লোকজন তাঁর পরিবারের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। তাঁর ভাষ্য, ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই মামলাটি করা হয়েছে। তিনি জানান, ফাতেমার জামিনের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে আইনি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা প্রতুল সেন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্যে অসঙ্গতি থাকলে বিষয়টি আদালতের নজরে এলে আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, শিশুসহ ফাতেমার কারাগারে থাকার বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন হলেও মানবিক দিক বিবেচনায় ফাতেমাকে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দিতে জেলা লিগ্যাল এইডকে অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এতিমখানায় থাকা তাঁর অপর দুই সন্তানের দেখভালের জন্য মহেশখালীর ইউএনওকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

