

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদী থেকে অজ্ঞাত শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিচয় শনাক্তের পর শিশু তাসপিয়ার সৎ বাবা শাফিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে ঘোড়াঘাট থানার ওসি গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার শাফিউল ইসলাম উপজেলার ভর্ণাপাড়া এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। শিশু তাসপিয়ার মৃত্যুর পর আত্মগোপনে চলে যান শাফিউল।
পুলিশের দাবী, শাফিউল ইসলাম ও লিজা দম্পতির পারিবারিক কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। করতোয়া নদী থেকে ৯ বছরের শিশু মসফিয়া আক্তার তাসপিয়ার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হৃদয়বিদারক তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
‘মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে যাচ্ছে’ ৯ বছরের তাসপিয়ার মুখে বলা এই কথাটিই হয়ে রইল তার শেষ কথা। ছোট্ট মেয়েটি জানত না, মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃত্যুর মুখে। রাতের অন্ধকারে নৌকায় করে করতোয়া নদীর মাঝখানে নিয়ে প্রথমে তাকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর শিশুটির প্রতি মায়া হলে পানি থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরেন সৎ বাবা। কিন্তু সেই মায়া টিকেনি বেশিক্ষণ। স্ত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তাসপিয়াকে আবারও নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
পুলিশের তথ্যমতে, রাণীগঞ্জ বাজার থেকে ভ্যানে করে কবিরপুর, এরপর গোবিন্দপুর হয়ে মুসিপাড়ার ঘাটে যান সাফিউল। পরে নদীর বাঁধ ধরে ভর্ণাপাড়া-গুয়াগাছি টঙ্গী ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন করতোয়া নদীতে নৌকা নিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। সময় তখন রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে। চারপাশ ছিল নিস্তব্ধ। নৌকা নদীর মাঝামাঝি পৌঁছালে তাসফিয়াকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
নদীতে ফেলে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর তাসফিয়ার প্রতি মায়া হয় শাফিউলের। তিনি পানি থেকে শিশুটিকে তুলে আবার নৌকায় নেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর নৌকা নিয়ে তীরে ফিরে আসেন। কিন্তু তীরে ফেরার পর ঘটে আরও ভয়াবহ ঘটনা।
তীরে ফেরার পর মুঠোফোনে স্ত্রী লিজার সঙ্গে শাফিউলের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার মধ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাসপিয়াকে তীরের কাছেই নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন তিনি। এরপর করতোয়ার কালো পানিতে হারিয়ে যায় শিশুটি।
পরদিন সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে করতোয়া নদীতে তাসপিয়ার মরদেহ ভেসে ওঠে। স্থানীয়রা মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয়রা জানান, ঢাকায় থাকা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। সময়ের সঙ্গে সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। গত ৯ আগস্ট ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন শাফিউল। এরপর ১৪ আগস্ট শুক্রবার তাসপিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর জন্য বিন্যাগাড়ি রোডে রানীগঞ্জ জোবাইদা মহিলা মাদ্রাসায় রেখে আসেন তিনি।
পরের দিন রোববার বিকেলে ভর্তি-সংক্রান্ত ছবি তোলার কথা বলে তাসপিয়াকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন শাফিউল। ওই দিন রাত ৯টা ১৬ মিনিটে তাসপিয়া নিজেই ফোন করে আগের মাদ্রাসায় জানায়, তাকে অন্য একটি মাদ্রাসায় রাখা হয়েছে। কিন্তু এরপর মাদ্রাসার পথে না গিয়ে শিশুটিকে নিয়ে একের পর এক জায়গা বদলাতে থাকেন শাফিউল।
এদিকে তাসপিয়ার জীবনও ছিল ভাঙা সংসারের গল্পে মোড়া। তার মা লিজার সঙ্গে বাবা মমিনুলের বিচ্ছেদ হয় ২০২২ সালে। এরপর তাসপিয়া আপন বাবার কাছেই থাকত। পরে লিজা শাফিউল ইসলামকে বিয়ে করেন। ২০২৫ সালের দিকে পরিবারের অগোচরে তাসপিয়াকে দ্বিতীয় স্বামীর কাছে নিয়ে আসেন তিনি।
এরপর শিশুটিকে সৎ দাদা-দাদির কাছে রেখে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চলে যান লিজা ও শাফিউল। লিজা পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। আর শাফিউল চালাতেন রিকশা। অভাবের সংসারে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দাম্পত্য কলহও।
এ ব্যাপারে ঘোড়াঘাট থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, শিশু তাসপিয়া হত্যার ঘটনায় তার সৎ বাবা শাফিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় শিশুটির নিজের বাবা বাদী হয়ে এজাহার দায়ের করেছেন। বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

