

মোঃ মেহেদী হাসান, পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: ইতিহাস-ঐতিহ্যের টানে রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ী ও জাদুঘরে প্রতিবছরই বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়ও। গত পাঁচ বছরে এখান থেকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ। তবে রাজস্ব আয় বাড়লেও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি ব্যয় হচ্ছে তার চেয়েও বেশি।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুঠিয়া রাজবাড়ী ও জাদুঘর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৮ টাকা। বিপরীতে আনসার, কাস্টডিয়ানসহ নিরাপত্তা ও বিভিন্ন খাতে বছরে সরকারি ব্যয় হচ্ছে ৬০ লাখ টাকার বেশি।
পুঠিয়া রাজবাড়ী ও জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৯ লাখ ৯৫ হাজার ১৯৫ টাকা। পরের অর্থবছর ২০২২-২৩-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫৫৫ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় ৩১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১০ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৫৫০ টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৫ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৮ টাকা আদায় হয়েছে।
অর্থাৎ পাঁচ বছরে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৩৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৯৩ টাকা। হিসাব বলছে, পাঁচ বছরে আয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ। কিন্তু এই বিপুল আয় সত্ত্বেও পুঠিয়ার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি ব্যয় আরও বেশি।
পুঠিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রাজবাড়ী, বড় গোবিন্দ মন্দির, রানী মহল ও রানীর ঘাট, ছোট আহ্নিক মন্দির, বড় শিব মন্দির, রথ মন্দির, দোল মন্দির, বড় আহ্নিক মন্দির, গোপাল মন্দির, ছোট গোপাল মন্দির, ছোট শিব মন্দির, হাওয়াখানা, কেষ্ট খ্যাপার মঠ ও কিসমত মারিয়া মসজিদসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রতিদিনই এসব স্থাপনা দেখতে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য, পুঠিয়ার মোট ১৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে বর্তমানে শুধু রাজবাড়ী থেকেই টিকিটের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। বাকি ১৬টি স্থাপনা দেখতে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে কোনো প্রবেশমূল্য নেওয়া হয় না। অথচ এসব স্থাপনার নিরাপত্তা ও দায়িত্ব পালনে আনসার ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের বেতনসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিবছর সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
পুঠিয়া রাজবাড়ী জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “পুঠিয়া ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে মোট ১৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজবাড়ী থেকেই সরকার রাজস্ব পাচ্ছে। বাকি ১৬টি স্থাপনাতেও বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী এলেও সেখান থেকে কোনো রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “সবগুলো স্থাপনাকে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে টিকিটের ব্যবস্থা করা গেলে সরকারের রাজস্ব আয় অনেক বাড়বে। সেই বাড়তি অর্থ দিয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, পুঠিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো শুধু রাজশাহীর নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনসম্পদ। পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও সব স্থাপনা থেকে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা না থাকায় সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তাঁদের মতে, একটি সমন্বিত পর্যটন ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় পুঠিয়ার সব প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে আনা গেলে একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণও আরও কার্যকর হবে।
প্রশ্ন উঠছে, পর্যটক বাড়ছে, রাজস্বও বাড়ছে, তবু ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও সংরক্ষণে যদি ব্যয়ের ঘাটতি থেকেই যায়, তাহলে পুঠিয়ার শত বছরের এই অমূল্য ঐতিহ্য কতটা নিরাপদ? সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নই আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

