

রমজান আলী, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীরা ও তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট ও দোয়া চাইছেন। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও এলাকার সার্বিক অগ্রগতির নানা প্রতিশ্রুতিতে পুরো নির্বাচনী এলাকা এখন সরগরম। একদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ, অন্যদিকে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।
এবারের নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলেও বাস্তব চিত্রে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলেও তার প্রচারণা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা।
চট্টগ্রাম–১৫ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শক্ত ঘাঁটি বা ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপি এই আসন পুনরুদ্ধারে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, দীর্ঘ সময় পর সরাসরি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে কাজ করছে।
বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, দলের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় সেখানে তিনি বাড়তি সমর্থন পেতে পারেন। দীর্ঘদিন পর লোহাগাড়া থেকে একজন শক্তিশালী এমপি প্রার্থী পাওয়ায় স্থানীয় ভোটাররা তাকে এগিয়ে রাখবেন—এমনটাই আশা করছেন তারা।
দুই প্রধান প্রার্থীর বাড়ি দুই উপজেলায় হওয়ায় ভোটের হিসাবেও ভৌগোলিক বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নাজমুল মোস্তফা আমিন ও তার নেতাকর্মীরা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। বিএনপি নেতাকর্মীদের মতে, দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে পারলে এই আসনে বিজয় অর্জন সম্ভব। প্রচারণায় তিনি সাতকানিয়া–লোহাগাড়ার মানুষের সেবক হিসেবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী তাদের ঐতিহ্যবাহী আসন ধরে রাখতে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। জামায়াতের সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। প্রচারণায় ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার তুলে ধরা হচ্ছে।
জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি, এবারের নির্বাচনে ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের বাস্তবতায় কয়েকটি দলের ভোট দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে যাবে। বিশেষ করে এলডিপি ও এনসিপির ভোট জোটগত কারণে তাদের দিকে আসবে।
এছাড়া আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রামের পরিচিত ও আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় সেটিও তার পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী চট্টগ্রাম–১৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫,০৬,০৫৯ জন। এর মধ্যে লোহাগাড়া উপজেলায় ভোটার ২,৪৯,৭৯০ জন এবং সাতকানিয়া উপজেলায় ভোটার ২,৫৬,২৬৯ জন। ভোটকেন্দ্রের দিক থেকে সাতকানিয়ায় রয়েছে ৯০টি এবং লোহাগাড়ায় ৬৭টি ভোটকেন্দ্র। সব মিলিয়ে এই আসনে মোট ১৫৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটার সংখ্যার এই প্রায় সমান বণ্টন নির্বাচনের ফলাফলকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটা'রা।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ভোটারদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় যে প্রার্থী সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ অন্যান্য ধর্মের ভোট বেশি আদায় করতে পারবে, সেই প্রার্থীই নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে থাকবে—এমনটাই ধারণা করছেন তারা।
এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শরীফুল আলম চৌধুরীর হাতপাখা প্রতীকের প্রচারণা এখনও তেমন জোরালো নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচন হবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে বলে ধারণা করছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামান্য ভোটের ব্যবধানেই এই আসনে জয়–পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে। সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, চট্টগ্রাম–১৫ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যেই। শেষ পর্যন্ত কে হাসবে শেষ হাসি—তা জানা যাবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, ভোট গণনা শেষে।

