

জিহাদ রানা, বরিশাল ব্যুরো চীফ: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনে ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১২৩ জন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। গত দুইদিন থেকে এসব প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী মাঠে চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। ফলে শহর ছেড়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পরেছে নির্বাচনী হাওয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনে প্রতীক বরাদ্দ পাওয়া ১২৩ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুইজন নারী প্রার্থী ভোট যুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে রয়েছেন। ফলে বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে কেবল দুইটি জেলায় দুইজন নারী প্রার্থীর দেখা মিলেছে। বাকি চার জেলায় ব্যালটে থাকছে না কোনো নারী প্রার্থীর নাম। দুইজন নারী প্রার্থীর শুধু পরিচয় নয়; তাদের রাজনৈতিক পথ পুরোটাই আলাদা। তাদের একজন চিকিৎসক, অপরজন সাবেক সংসদ সদস্য। কিন্তু নির্বাচনী মাঠে নামার পর স্পষ্ট হয়, এই লড়াই শুধু ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রতিযোগিতা সামাজিক অবস্থান, আর্থিক সক্ষমতা আর রাজনৈতিক পুঁজি ঘিরে।
সূত্রমতে, বরিশাল-৫ (সদর) আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের সাথে ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মাঠে রয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ মনোনীত মই মার্কার প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী। সংসদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন নিবার্চনেও রয়েছে তার অভিজ্ঞতা।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর স্বজনদের সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তার প্রচারণা। সীমিত সম্পদ, পরিচিতজনের সহযোগিতা আর অল্পস্বল্প স্বেচ্ছাশ্রমে এগোচ্ছে তার নির্বাচনী প্রচারণা। বড় ব্যানার বা শোভাযাত্রা নেই। রয়েছে নিয়মিত হাঁটা, মানুষের সাথে কথা বলা আর নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা।
অন্যপ্রান্তে রয়েছেন ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ মার্কার প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো। তার ক্ষেত্রে এখনো স্পষ্ট পুরনো ক্ষমতার ছাপ। রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী।
মনীষার ভরসা মাটির ব্যাংক
বরিশাল-৫ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ মনোনীত প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীর বয়স ৩৫ বছর। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসক। মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামা অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা একটি মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। মারামারির একটি মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন।
মনীষার ঘোষিত অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এরমধ্যে নগদ ১২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, ব্যাংকে চার লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী আমানত পাঁচ লাখ টাকা। রয়েছে পাঁচ ভরি সোনা। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ৬৯ হাজার টাকা। বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা। চিকিৎসা পেশা ও ব্যাংকের মুনাফা মিলিয়ে মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তার মোট সম্পদ ২২ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী নির্ভর করছেন পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার ওপর। বোন তন্দ্রা চক্রবর্ত্তী ধার দেবেন তিন লাখ টাকা, কাকাতো ভাই দুই লাখ টাকা। বাবা তপন চক্রবর্ত্তী দিবেন ৫০ হাজার টাকা।
ইলেন ভূট্টোর পুরনো ক্ষমতার ছাপ
ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ মার্কার প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টোর বয়স প্রায় ৬০ বছর। ২০০১ সালে তিনি সরাসরি ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। স্বামী প্রয়াত জুলফিকার আলী ভূট্টো ছিলেন ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্য।
হলফনামা অনুযায়ী ইলেন ভূট্টোর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা। নগদ রয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার টাকা, ব্যাংকে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি প্রাইভেট কার ও ৩০ তোলা সোনা রয়েছে। কৃষি ও অকৃষি জমির মূল্য ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িও রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তার মোট সম্পদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ছয় লাখ ৭৩ হাজার টাকা এবং ঘোষিত ব্যয় ১৫ লাখ টাকা।
বরিশাল মহিলা পরিষদের সভানেত্রী অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, বিভাগের ২১টি আসনের ১২৩ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন মাত্র দুইজন। এ থেকে প্রমাণিত হয় রাজনীতিতে নারীদের জন্য এখনও সমান মাঠ প্রস্তুত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও মনোনয়নে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, সংসদে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বক্তৃতায় যতটা সরব, প্রার্থী তালিকায় তার ছাপ ততটাই অনুপস্থিত। এবারের নির্বাচনে বরিশাল বিভাগে সেই পুরনো বাস্তবতাকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

