

দেশে প্রতিবছর চা উৎপাদন বাড়লেও সেই তুলনায় ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি শ্রমিকদের। অভাব-অনটনের মধ্যে চলছে তাদের জীবন। দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে হিমশিম খাচ্ছে সংসার চালাতে। শ্রমিকদের অভিযোগ, অধিকাংশ চা বাগান স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার যথাযথভাবে পূরণ করে না। শ্রম আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় অধিকার থেকে বঞ্চিত তারা।
মূলত, চা শিল্পের সঙ্গে শ্রমিকদের সম্পর্ক বংশ পরম্পরায়। যাদের শ্রমের ঘামে এগিয়ে যাচ্ছে চা শিল্প, সেই শ্রমিকরা এখনও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে বন্দি। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনভর খাটুনির পর একজন স্থায়ী শ্রমিক দৈনিক মজুরি পান সর্বোচ্চ ১৮৭ টাকা। এই আয় দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।
একজন নারী শ্রমিক বলেন, যে টাকা মজুরি পাই, সেটা দিয়ে সংসারের খরচ চলে যায়। আমরা ডাক্তার দেখাবো, আমাদের সেই টাকাও নেই। বাজারে গিয়ে সবজি, মাছ খাবো, টাকা নেই। আমরা কোথা থেকে খাওয়ার টাকা জোগাড় করবো?
আরেকজন বলেন, রোদের মধ্যে জ্বলি (পুড়ি), বৃষ্টি আইলে (আসলে) বৃষ্টির মাঝে ভিজি। এতে আমাদের বেশ কষ্ট হয়।
অন্যদিকে, একজন পুরুষ শ্রমিক বলেন, ঐ ২০০ টাকা দিয়ে যদি দিন গুজরান (জীবিকা নির্বাহ) হয়, তো বাচ্চা-কাচ্চা কীভাবে লেখাপড়া করবে বা আমরা কীভাবে চলবো। বাজারে জিনিসপত্রেরও দাম বেশি।
মজুরির অবস্থা ছাড়াও অধিকাংশ চা শ্রমিকের বাসস্থানও জরাজীর্ণ। আর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকায় বিভিন্ন রোগে ভুগছেন অনেকে।
একজন নারী শ্রমিক বলেন, বৃষ্টির সময়ে আমাদের থাকার মতো জায়গা, বাসা নেই। বাসা থাকলে তো বাসার মধ্যে থাকবো। চারাগাছের নিচে আমরা হামাগুড়ি দিয়ে কোনোরকম বসে থাকি।
আরেক পুরুষ শ্রমিকও তুলে দুরদশার কথা, আমাদের চার-পাঁচজনের নিয়ে কোনো রকম পেট চালাতে (সংসার) পারবো, সেই মানসম্মত মজুরি আমাদের কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। চা বাগানের চিকিৎসার মান একেবারেই নিম্নমানের। এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নেই।
শ্রম আইন অনুযায়ী মৌলিক অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি ভূমির অধিকার, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানীয় জলের ব্যবস্থা, চাকরি ও শিক্ষা কোটা সংরক্ষণ, কল্যাণ ফান্ড চালুর দাবি শ্রমিকদের।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, শ্রমিকরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। যেমন বসতভিটা। এই ১৫০-২০০ বছর ধরে তারা এখানে আছে, কিন্তু তাদের কোনো ভিটেমাটি নেই।
তবে বাগান কর্তৃপক্ষের দাবি, চায়ের দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মালিকরা। লোকসানে অনেক মালিক শ্রমিকদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বাংলাদেশ চা সংসদের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, তারা বৃষ্টি, রোদের মধ্যে সারাদিন খেটে কাজ করে।
শ্রম আইনে চা শ্রমিকদের যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে শ্রম অধিদফতর।
বিভাগীয় শ্রম দফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, চা বাগানের গৃহায়ন সুবিধা, শ্রমিকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ, প্রচলিত প্রথা ও সুযোগ-সুবিধা এবং তাদের নানাবিধ অসুবিধা দূরীকরণে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, এসব সুবিধা শ্রমিকরা যাতে নিয়মিত পায়, সেজন্য আমরা এবং আমাদের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর নিয়মিত পরিদর্শন করে থাকে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, চা শিল্পে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। এদের দুই-তৃতীয়াংশ মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানে বসবাস করেন।

