

বাগেরহাট প্রতিনিধি: দারিদ্র্য তার পড়াশোনার পথ থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু থামাতে পারেনি স্বপ্ন আর উদ্ভাবনী শক্তিকে। সীমিত সামর্থ্য, অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমকে সঙ্গী করে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ১৬ বছর বয়সী কিশোর শেখ মোজাহিদ নিজ হাতে তৈরি করেছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী মোটরসাইকেল। মাত্র ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৬ মাসের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি এই মোটরসাইকেল এখন এলাকাজুড়ে আলোচনার বিষয়।
রামপাল উপজেলার বাইনতলা ইউনিয়নের কোমলাই গ্রামের ৬ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শেখ মোজাহিদ। তার বাবা শেখ আজিবর পেশায় একজন ভ্যানচালক। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে সপ্তম শ্রেণির পরই বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। তবে ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতির প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই বাড়ির পাশে একটি ছোট গ্যারেজ গড়ে তোলে সে। সেখানে সাইকেল, ভ্যান ও রিকশা মেরামতের কাজ করতে করতেই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে নিজের স্বপ্নের মোটরসাইকেল তৈরি করেছে মোজাহিদ।
মোজাহিদের বাবা শেখ আজিবর বলেন, অভাবের কারণে ছেলেকে আর পড়াশোনা করাতে পারিনি। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। তাই সে বাড়ির পাশেই একটি গ্যারেজ করেছে। সেখানে সাইকেল, ভ্যান ও রিকশা মেরামতের কাজ করে। ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু বানানোর প্রতি তার আগ্রহ। আজ নিজের চেষ্টায় মোটরসাইকেল তৈরি করেছে। কেউ যদি ওর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আরও ভালো কিছু করতে পারবে।
কিশোর উদ্ভাবক শেখ মোজাহিদ বলেন, বাবার সামর্থ্য না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। গ্যারেজে কাজ করতে করতেই নতুন ও ব্যতিক্রম কিছু তৈরির চিন্তা মাথায় আসে। প্রথমে একটি সাইকেলে ইঞ্জিন বসিয়ে চালাই। কয়েক মাস সেটি ব্যবহারের পর আরও উন্নত কিছু করার ইচ্ছা হয়। এরপর ধীরে ধীরে এই মোটরসাইকেলটি তৈরি করি। এটি বানাতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। মোটরসাইকেলটির সামনে সাইকেলের চাকা এবং পেছনে মোটরসাইকেলের চাকা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে একটি ফ্রিডম মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রায় ৭০ কেজি ওজনের বাহনটিতে তিন ধরনের সাউন্ড সিস্টেম রয়েছে। সাড়ে তিন লিটার জ্বালানি ধারণক্ষমতার এই মোটরসাইকেল এক লিটার পেট্রোল বা অকটেনে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার চলতে পারে বলে দাবি তার।
মোজাহিদ বলেন, ভবিষ্যতে আরও আধুনিক ও উন্নতমানের যানবাহন তৈরি করতে চাই। নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে চাই। শুধু একটু সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেলে আমার স্বপ্ন পূরণ হবে।
মোজাহিদের শিক্ষক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই সে কৌতূহলী ও পরিশ্রমী। সুযোগ-সুবিধার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও শেখার আগ্রহ কখনো কমেনি। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে সে আরও বড় কিছু করতে পারবে।
বন্ধু কালাম বলেন, দিনের পর দিন গ্যারেজে কাজ করে মোজাহিদ এই মোটরসাইকেলটি তৈরি করেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত। সরকারি সহযোগিতা পেলে সে আরও ভালো কিছু উদ্ভাবন করতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের এলাকায় এমন প্রতিভাবান ছেলে খুব কমই দেখা যায়। অভাবের মধ্যেও সে যা করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তার মতো আরও অনেক তরুণ উৎসাহিত হবে।
রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌসি বলেন, এত অল্প বয়সে এমন উদ্ভাবনী উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এটি শুধু রামপাল নয়, পুরো বাগেরহাটের জন্য গর্বের বিষয়। মোজাহিদ যদি কোনো ধরনের সহযোগিতা চায়, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।
বর্তমানে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মোজাহিদের তৈরি মোটরসাইকেলটি দেখতে আসছেন। তার উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, যথাযথ কারিগরি প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহায়তা পেলে এই কিশোর উদ্ভাবক একদিন দেশের জন্য আরও বড় উদ্ভাবন উপহার দিতে সক্ষম হবে।

