ঢাকা
২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৯:০০
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

সমুদ্রের কোল ঘেঁষে যে বাতিঘর জ্বলে, পবিপ্রবির ২৪ বছরে পা রাখার গল্প

পবিপ্রবি প্রতিনিধি: দুমকির আকাশটা অন্য রকম। এখানে সূর্য ওঠে একটু ধীরে, আবার অস্ত যায় বিস্তৃত লালচে আলো ছড়িয়ে। কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা সবুজের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ক্যাম্পাস যেন এই আলোরই ধারক—নাম তার পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)।

পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো পরিবারের আশা–ভরসার নাম। ১০৯ দশমিক ৯৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত সবুজ শ্যামল ক্যাম্পাসে প্রতিদিন ভিড় করে স্বপ্ন—কেউ হতে চায় গবেষক, কেউ প্রশাসক, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ বা শিক্ষক।

ছোট্ট বীজ থেকে মহীরুহ

পবিপ্রবির যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, তবে বর্তমান রূপ পেতে সময় লেগেছে দীর্ঘদিন। একসময় এই এলাকাতেই গড়ে ওঠে বেসরকারি জনতা কলেজ। সেখান থেকে কৃষি শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে এটি রূপ নেয় কৃষি কলেজে। উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তবতা—লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও মৎস্য সংকট—এসব মোকাবিলায় দক্ষ জনবল তৈরির প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা।

২০০১ সালের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’। এরপর ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে পবিপ্রবি। সেই দিনটিই আজ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস—শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাছে যা গর্ব আর আবেগের এক বিশেষ দিন।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার দর্শন

“মানসম্পন্ন প্রযুক্তিসমৃদ্ধ উচ্চ শিক্ষাই হোক দিন বদলের হাতিয়ার”—এই স্লোগান পবিপ্রবির দেয়ালে শুধু লেখা নয়, এটি এখানে প্রতিদিন চর্চা করা হয়। উপকূলীয় বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যা সামনে রেখে পাঠ্যক্রম ও গবেষণার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, পরিবেশ সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই পবিপ্রবি ভূমিকা রাখছে জ্ঞান উৎপাদনের মাধ্যমে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীকারে উচ্চারিত হয়—“আমরা শিখবো, লড়বো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাসযোগ্য মাতৃসম বাংলাদেশ গড়বোই।”

একাডেমিক বিস্তার

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়টি অনুষদের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। কৃষি, মৎস্যবিজ্ঞান, এ্যানিমাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসায় প্রশাসন, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স, ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং ওশানোগ্রাফি—প্রতিটি অনুষদই সময়োপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে।

ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদানের ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। অনেক গ্র্যাজুয়েট দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে সফলভাবে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।

গবেষণা, গ্রন্থাগার ও সৃজনশীল চর্চা

পবিপ্রবির গবেষণার পরিসর দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। আধুনিক গবেষণাগার, আইটি ল্যাব, প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলজি ল্যাব, বিভিন্ন গবেষণা খামার ও ইনোভেশন ডিসেমিনেশন সেন্টার শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহ জোগাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি যেন জ্ঞানের এক নীরব ভাণ্ডার। প্রায় ২৮ হাজার বইয়ের পাশাপাশি দেশি–বিদেশি অসংখ্য ই-জার্নালের প্রবেশাধিকার রয়েছে এখানে। ইউজিসি ডিজিটাল লাইব্রেরির সদস্য হওয়ায় বিশ্বের নামকরা প্রকাশকদের গবেষণাও শিক্ষার্থীরা সহজেই পড়তে পারে।

চারতলা বিশিষ্ট ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ও ৪৫০ আসনের অডিটোরিয়াম ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এখানে হয় বিতর্ক, নাটক, সংগীত আর নানা সৃজনশীল আয়োজন।

ইতিহাস ও সম্প্রীতির পাঠ

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে স্থাপিত সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য প্রতিদিন নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের কথা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের চেতনা বহন করে। একই ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মসজিদ ও শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ কেন্দ্রীয় মন্দির ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন

মূল ক্যাম্পাসে ছয়টি এবং বরিশাল ক্যাম্পাসে দুটি আবাসিক হল শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। চারতলা বিশিষ্ট হেলথ কেয়ার সেন্টার থেকে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। নিজস্ব বাস সার্ভিস পটুয়াখালী ও বরিশাল রুটে নিয়মিত চলাচল করে, যা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াত সহজ করেছে।

সামনে তাকিয়ে

২৪ বছরে পা রাখা পবিপ্রবি আজ আত্মবিশ্বাসী। সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্পই এর পরিচয়। আধুনিক কারিকুলাম, গবেষণামুখী শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় স্বপ্ন দেখছে—একদিন শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ারও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হয়ে ওঠার।

সমুদ্র খুব কাছে। বাতাসে লবণের গন্ধ। সেই বাতাসের মধ্যেই নীরবে, দৃঢ়ভাবে জ্বলে উঠেছে জ্ঞানের এক বাতিঘর—পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮, মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1736 786915, +880 1300 126 624, ইমেইল: online.bdsangbad@gmail.com (online)
news@bd-sangbad.com, ads@bd-sangbad.com
বাংলাদেশ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।  অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram