ঢাকা
প্রকাশিত : September 22, 2026
আপডেট: September 22, 2026
প্রকাশিত : September 22, 2026

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮ মাসে পানিতে ডুবে ৪৮ জনের মৃত্যু

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের চার প্রধান নদীসহ বিভিন্ন জলাশয়ে গোসল, মাছ ধরা, নৌকা পারাপার কিংবা খেলতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পানিতে ডুবে ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী। প্রায় ১৮ লাখ মানুষের এই সীমান্ত জেলায় পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষ উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকায় বিপদের সময় রাজশাহী থেকে ডুবুরি দলের আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় স্বজনদের। এতে উদ্ধারকাজে বিলম্বের পাশাপাশি ক্ষোভ বাড়ছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে। জেলায় অবিলম্বে স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট চালু এবং দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

প্রায় ৬৫৮ বর্গমাইল আয়তনের সীমান্তঘেঁষা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রধান চার নদী-পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবাসহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য খাল, বিল ও নিচু জলাশয়। এসব চার নদীর জলপথ প্রায় ১৮৪ কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নদী-নালা পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এ সময় গোসল, মাছ ধরা, নৌকা পারাপার কিংবা খেলতে গিয়ে শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ঘাটগুলোতে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড নেই। নদী পারাপারের সময় লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহারও নিশ্চিত করা হয় না। নেই পর্যাপ্ত আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, জেলায় নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারে রাজশাহী থেকে ডুবুরি দলের আসার অপেক্ষা করতে হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, জানুয়ারিতে ৬, ফেব্রুয়ারিতে ১, মার্চে ৪, এপ্রিলে ৩, মে মাসে ৫ এবং জুনে ৫ জন পানিতে ডুবে মারা যান। জুলাই ও আগস্টে নদী-নালায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণহানি বেড়ে যায়। জুলাইয়ে ১১ জন এবং আগস্টে জেলাজুড়ে রেকর্ড ১২ জন পানিতে ডুবে মারা যান। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত পানিতে ডুবে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ৭০টি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৫৩টি।

গত ২৮ আগস্ট জেলার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে সদর উপজেলার দেবীনগরের চরচাকলা গ্রামে। পদ্মা নদীর শাখা ‘মরা নদী’তে জুমার নামাজের সময় বড়দের অগোচরে গোসল করতে নেমে একে একে পাঁচ শিশু তলিয়ে যায়। তারা সবাই সম্পর্কে মামাতো, ফুপাতো ও চাচাতো বোন। তাদের মধ্যে চারজন চরচাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একজন চরদেবিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। আর গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুরে পদ্মা নদীতে গোসল করার সময় প্লাস্টিকের বোতল কুড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায় ১০ বছরের শিশু সোহান আলী।

পানিতে তলিয়ে যাওয়া স্বজনদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার মহানন্দা নদীতে ডুবে মারা যাওয়া এক শিশুর বাবা আশরাফুল ইসলাম বলেন, “ছেলেটা যখন নদীতে তলিয়ে গেল, আমরা ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিলাম। কিন্তু তারা এসে বলল-পানিতে নামার লোক নেই। রাজশাহী থেকে ডুবুরি আসতেই তিন-চার ঘণ্টা পার হয়ে গেল। যদি জেলাতেই ডুবুরি থাকত, তাহলে হয়তো আমার সন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা যেত।”

শিবগঞ্জ উপজেলার পনেররশিয়া এলাকার বাসিন্দা দুলাল হোসেন বলেন, “১৮ লাখ মানুষের জেলায় ফায়ার সার্ভিস আছে, অথচ নদীতে নামার ডুবুরি নেই। পানিতে মানুষ ডুবে যাওয়ার পর চাতক পাখির মতো রাজশাহীর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের দিকে তাকিয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছু নয়।”

একসঙ্গে চার মেধাবী ছাত্রীকে হারিয়ে চরচাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ক্লাসে ১ থেকে ১০ রোলের মধ্যে থাকা শান্ত ও মেধাবী মেয়েদের এই অকাল মৃত্যু পুরো বিদ্যালয়কে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মুনিরুজ্জামান মুনির বলেন, জেলায় ফায়ার সার্ভিসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা নেই-এটি খুবই দুঃখজনক। পানিতে ডুবে কেউ মারা গেলে রাজশাহী থেকে ডুবুরি দল এসে নদীতে সন্ধান চালাতে হয়। অনেক সময় তারা আসতে দেরি করে। ততক্ষণে স্বজনরা সন্তানকে খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ ঘাটে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম, জেলায় নিজস্ব ডুবুরি দল, দুর্ঘটনা কমাতে সাঁতার প্রশিক্ষণ, নিরাপদ ঘাট ও দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।

উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক শেখ মো. মাহবুবুল ইসলাম জানান, জেলায় স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট চালুর জন্য একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডুবুরি পাওয়া যাবে।

সম্প্রতি দেবীনগরে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় তরুণদের লাইফ-সেভিং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মো. জবেদ আলী।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাইনবোর্ড টাঙানো এবং নদী পারাপারের সময় যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী জানান, প্রাণহানি কমাতে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট চিহ্নিতকরণ, উদ্ধার কার্যক্রম বেগবান এবং জেলায় স্থায়ীভাবে ডুবুরি দল নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।

সর্বশেষ
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮, মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1736 786915, +880 1300 126 624, ইমেইল: online.bdsangbad@gmail.com (online)
news@bd-sangbad.com, ads@bd-sangbad.com
বাংলাদেশ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।  অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram