

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: টানা ভারী বর্ষণে দ্বিতীয় দিনের মতো জলাবদ্ধতায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। মঙ্গলবারের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের পর বুধবারও থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নগরের অধিকাংশ নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। যদিও আগের দিনের তুলনায় বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে। সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) সকাল থেকে নগরের চকবাজার, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, মোহরা, কুয়াইশ, অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বাকলিয়া, ফিরিঙ্গিবাজার, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার চিত্র দেখা যায়। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেকেই কোমরসমান পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হন, আবার অনেকে বাসা থেকে বেরই হতে পারেননি।
নগরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকার নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় মালামালের ক্ষতি হয়েছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। অনেককে শুকনো খাবার খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
চট্টগ্রামের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র আগ্রাবাদে হাঁটুসমান পানি জমে অধিকাংশ অফিস, ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নগরের বাইরে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, পটিয়া, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, মীরসরাইসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক গ্রামীণ সড়ক ডুবে গেছে। নিম্নাঞ্চলের হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সন্দ্বীপের সঙ্গে নৌযোগাযোগও বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে পানি জমে যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে। এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের কয়েকটি অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় কক্সবাজারগামী ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ষোলশহর স্টেশনে আটকে পড়া কক্সবাজারগামী একটি ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করা হয়েছে। এতে শত শত যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে বুধবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা এবং শ্রেণি কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও শিক্ষা কার্যক্রমে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জলাবদ্ধতার অসংখ্য ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ, সড়কে আটকে থাকা যানবাহন এবং পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন এলাকার দৃশ্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে দুর্গত মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন ৪০৮ মিলিমিটার এবং ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানিয়েছেন, সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় পানি বৃদ্ধির ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
অন্যদিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও বুধবার পর্যন্ত সব ফ্লাইট নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিকের ১০১ সদস্যের র্যাপিড রেসপন্স টিম মাঠে কাজ করছে। যেসব এলাকায় পানি দীর্ঘসময় আটকে রয়েছে, সেখানে নালা-নর্দমা পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে চসিক ও সিডিএর কর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

