ঢাকা
১১ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৯:২৮
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১১, ২০২৬
আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০২৬
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১১, ২০২৬

মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারে ফুটছে বিদেশি ফুল ন্যাস্টারশিয়াম

মো. আবুল হাসেম, মাটিরাঙ্গা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি: মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শেষে শীতের হিমেল হাওয়ায় পাহাড় যখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে, ঠিক তখনই খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বুক চিরে জেগে ওঠে এক জাদুকরী রঙের মেলা। পাহাড়ি ঢালে সবুজের গালিচায় যেন কেউ ঢেলে দিয়েছে কমলা, হলুদ আর টকটকে লাল রঙের আবির। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে জ্বলছে সহস্র প্রদীপ। এই মুগ্ধতার কারিগর আর কেউ নয় ভিনদেশি ফুল ন্যাস্টারশিয়াম।

সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকার উচ্চভূমির এই ফুলটি এখন মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি আবহাওয়ায় নিজের বসতি গড়েছে। এর গোলাকার পাতা আর উজ্জ্বল পাঁপড়ির বিন্যাস পর্যটক ও স্থানীয়দের মুগ্ধ করেছে। পাহাড়ের উঁচু-নিচু ঢালে লতানো এই গাছগুলো যখন একসাথে ফুল ফোটায়, তখন মনে হয় পাহাড়টি কোনো দক্ষ শিল্পীর ক্যানভাস।

ন্যাস্টারশিয়ামের বিশেষত্ব হলো এর রঙের তীব্রতা। রোদের আলো যখন পাহাড়ের ভাঁজে পড়ে, তখন এই ফুলগুলো এক অদ্ভুত দ্যুতি ছড়ায়। মাটিরাঙ্গা উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টারে বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে শীতকালীন ন্যাস্টারশিয়ামের চাষ করা হচ্ছে। উজ্জ্বল কমলা ও হলুদ রঙের এই ফুলগুলো গোলাকার সবুজ পাতার ভেতর ফুটে উঠেছে দৃষ্টিনন্দনভাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ন্যাস্টারশিয়াম বিদেশি জাতের হওয়ায় দেশে এর বীজ সহজলভ্য নয়।

উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সিনজেটা কোম্পানির প্যাকেটজাত বীজ থেকে প্রতিটি ১০ টাকায় ১০০টি বীজ সংগ্রহ করে গত ২০ নভেম্বর ন্যাস্টারশিয়ামের বীজ রোপণ করা হয়। অনুকূল আবহাওয়া এবং স্বল্প পরিচর্যায় অল্প সময়ের মধ্যে গাছগুলো দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং বর্তমানে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। এছাড়াও এখানে পিটুনিয়া, গোলাপ, গাঁদা সহ বিভিন্ন বাহারি ফুল, ফল ও সবজির চারা বিক্রি করা হয়।

ন্যাস্টারশিয়াম একটি উজ্জ্বল সবুজ ছাতা আকৃতির বৃত্তাকার পাতাবিশিষ্ট উদ্ভিদ। এতে চমৎকার রংবেরঙের ফুল থাকে, যা টব বা ল্যান্ডস্কেপে সাজালে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। সাধারণত শীতের সময় এই ফুল ফোটে। উদ্ভিদের কাণ্ড লম্বা, চিকন ও দুর্বল, যা লতানো অবস্থায় মাটিকে ঢেকে রাখে। বীজ থেকে চারা হয়, তাই একবার গাছ রোপণ করলে সেই গাছ থেকেই বীজ সংগ্রহ করা যায়। গাছটি আড়াই থেকে তিন মাসে ফুল দেয়।

ন্যাস্টারশিয়াম একাধারে শৌখিন, ভোজ্য ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। ফুল ও পাতাকে সালাদে ব্যবহার করা যায়, যার স্বাদ হালকা ঝাঁঝালো। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি ‘এডিবল ফ্লাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত। এতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক বলে উদ্যান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

চাষ পদ্ধতি তুলনামূলক সহজ। মাঝারি পানি, ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকলেই টব বা মাটিতে ভালো ফলন পাওয়া যায়। পাহাড়ি অঞ্চলের শীতল ও আর্দ্র আবহাওয়া এই ফুল চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হওয়ায় পার্বত্য জেলাগুলোতে এর সম্ভাবনা রয়েছে।

পর্যটক ও স্থানীয়রা মুগ্ধ হয়ে বলছেন, “পাহাড়ের সবুজের মাঝে এমন রঙিন জাদু আগে কখনো দেখিনি!” অনেকে চারা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন নিজের বারান্দা বা বাগান সাজানোর স্বপ্ন নিয়ে।

পর্যটক রমিজ মিয়া বলেন, “পরিকল্পিতভাবে এই ফুলের চাষ করা গেলে মাটিরাঙ্গা দেশের অন্যতম ‘ফ্লাওয়ার ট্যুরিজম’ স্পট হয়ে উঠতে পারে। বিদেশের টিউলিপ বা ল্যাভেন্ডার বাগান দেখার হাহাকার মাটিরাঙ্গার ন্যাস্টারশিয়াম পূরণ করতে সক্ষম।”

মাটিরাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোস্তফা কামাল বলেন, “ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। এখানকার ফুলগুলো সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। বিশেষ করে ন্যাস্টারশিয়াম ফুলের উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় রঙ আগে কখনো দেখিনি। জানা মাত্র আরও অবাক হয়েছি যে, এই ফুল ও পাতাও খাওয়া যায়। এখানে এসে নতুন ও ব্যতিক্রমী অনেক কিছু দেখার সুযোগ হলো।”

নাসরিন আক্তার বলেন, “পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে ন্যাস্টারশিয়াম ফুলের উজ্জ্বল রঙ দারুণভাবে মানিয়ে গেছে। এমন নান্দনিক বিদেশি ফুলের চাষ আরও বিস্তৃত করলে সৌন্দর্য বাড়বে এবং পর্যটকদের আকর্ষণ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।”

মাটিরাঙ্গা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক আব্দুর রহিম বলেন, “ন্যাস্টারশিয়াম কেবল সৌন্দর্যবর্ধনই নয়, এটি পাহাড়ের রুক্ষ মাটিতেও খুব সহজে মানিয়ে নিয়েছে। কোনো রাসায়নিক সার ছাড়াই প্রাকৃতিক জৈব সারেই এই ফুল জাদুকরী গতিতে ফলছে।”

মাটিরাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক আবদুল হামিদ বলেন, “নতুন জাতের ফুল চাষে মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করতে মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যোগ কৃষি ও উদ্যান খাতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।”

উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, “ন্যাস্টারশিয়াম বাণিজ্যিক চাষের পাশাপাশি ছাদবাগান ও শৌখিন বাগানে নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম। এর উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় রঙের ফুল পরিবেশকে রাঙিয়ে তোলে এবং এটি বিদেশি ফুল চাষে আগ্রহী কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনাময় ফসল।”

ফলস্বরূপ, মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারে ঘুরে ন্যাস্টারশিয়ামের জাদুকরী রঙের সঙ্গে নিজেকে মুগ্ধ করুন। পাহাড়ের কোলে ফুটে ওঠা এই বিদেশি সৌন্দর্য আপনার মনকে সতেজ করে তুলবে নিশ্চিত।

সর্বশেষ
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮, মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1736 786915, +880 1300 126 624, ইমেইল: online.bdsangbad@gmail.com (online)
news@bd-sangbad.com, ads@bd-sangbad.com
বাংলাদেশ সংবাদ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।  অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram