

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখানে যে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। একদিকে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, অন্যদিকে কৌশলী জামায়াত এবং জোটের শরিকদের ভিন্নমুখী অবস্থান—সব মিলিয়ে ছাতক-দোয়ারাবাজার নির্বাচনী মাঠজুড়ে ভোট বিপ্লবে বিভাজন স্পষ্টতই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সাধারণ ভোটাররা পুড়ছেন বিএনপির গৃহদাহে, মিলনের গলার কাঁটা এখন ‘বিদ্রোহী’ মিজান। এই আসনে এবার দলটির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক ও সাবেক এমপি কলিমউদ্দিন আহমেদ মিলন দলীয় মনোনয়ন পেলেও তার জন্য বিদ্রোহী প্রার্থী মিজান এখন অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্ররভাবশালী প্রার্থী হিসেবে কোমর বেঁধে মাঠে থাকায় বিএনপি এখন আক্ষরিক অর্থেই বিভক্ত।
গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের যাচাই-বাছাইয়ে কলিমউদ্দিন মিলন এবং মিজানুর রহমান চৌধুরী—উভয়েরই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। মিজানের পক্ষে স্থানীয় বিএনপির একটি শক্তিশালী অংশ প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে। মাঠ পর্যায়ের তথ্যমতে, ছাতক ও দোয়ারাবাজারের দলীয় বিভাজনে মিলনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে পারে। বিএনপির এই 'ভোট বিভাজন' শেষ পর্যন্ত কলিমউদ্দিন মিলনের জয়ের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করেও তুলতে পারে এমন মতামত অনেকের।
এদিকে এ আসনে ১২ দলীয় জোট নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তেমন একটা তোড়জোড় না দেখা গেলেও বিএনপির এই সংকটকে নিজেদের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মনোনীত প্রার্থী আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম (মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী) ইতিমধ্যে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে বিএনপি দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে একে অপরের শক্তির অপচয় করছে, সেখানে জামায়াত তাদের ক্যাডারভিত্তিক ভোটব্যাংককে অটুট রেখে সাধারণ ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিলন ও মিজানের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হলেও জামায়াতের প্রার্থী খুব একটা বাজিমাত করে দিতে পারে এমন শঙ্কা নিতান্তই কম, তবুও বিষয়টি সহজভাবে নেওয়ারও সুযোগ আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে জামায়াত এখন 'ধীরে চলো' নীতিতে বিএনপির কোন্দল আরও ঘনীভূত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ভোটের মাঠে কৌশলে একটা বিস্ফোরণ ঘটাতে মরিয়া এখন জামায়াত। তবে জামায়াত জোটেও অন্তর বিভাজনের আভাস লক্ষ্য করা গেছে।
বিশেষত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কে ঘিরে এই আসনে জামায়াতের জন্য ফ্যাক্টর হতে পারে খেলাফত মজলিসও।
কেন্দ্রীয় ভাবে আসন সমঝোতার পয়েন্টে খেলাফত মজলিস উপেক্ষিত হলে কিংবা জামায়াতের নেতৃত্বে পরিচালিত জোটের মধ্যে ভাঙনের সুর বেজে উঠলে এই আসনে নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এখানে জোটের অন্যতম শরিক খেলাফত মজলিস থেকে দেওয়ালঘড়ি প্রতীকের মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছেন মাওলানা আব্দুল কাদির। তিনি মনোনয়ন জমা দিয়ে ক্ষান্ত হননি তাঁর দলের নেতাকর্মীরা মাঠে কাজও করছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন ভাগাভাগি নিয়ে জোটের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষিত হলে খেলাফত মজলিসের এই অবস্থান জামায়াতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, খেলাফত মজলিসেরও এই অঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। মাওলানা আব্দুল কাদির যদি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকেন, তবে জামায়াতের ধর্মীয় ভোটগুলো ভাগ হয়ে যাবে, যা পরোক্ষভাবে আবার বিএনপি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সুবিধা দিতে পারে।
ছাতক ও দোয়ারাবাজারের সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা বড় দলগুলোর এই কোন্দলে বিরক্ত। উন্নয়ন বনাম কোন্দল—এই দুইয়ের লড়াইয়ে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কার দিকে ঝুঁকবেন, তা নির্ভর করছে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে। অপেক্ষা করবে প্রার্থীতা প্রত্যাহার কিংবা ১২ দলীয় জোটের চূড়ান্ত সমঝোতার ওপর।
অপরদিকে বিএনপির হাই কমান্ড যদি মিজানুর রহমান চৌধুরী কে বসাতে না পারে, তবে এই আসনটি বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীর জন্য কঠিন পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনে এবার আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ বেশি প্রকট। বিএনপির জন্য এটি ঘর গোছানোর পরীক্ষা, আর জামায়াতের জন্য চমক দেখানোর সুযোগ। শেষ হাসি কে হাসবেন, তা নির্ভর করছে ছাতক-দোয়ারাবাজারের সাধারণ ভোটারদের নীরব ভোট বিপ্লবের ওপর।

