

জসিম সিদ্দিকী, কক্সবাজার: কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে সৃষ্ট আগুন প্রায় ৩৪ ঘন্টা পেরিয়েও নেভানো যায়নি। আগুনের উৎস ও গ্যাসের প্রকৃতি জানতে ঘটনাস্থলে নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)-এর বিশেষজ্ঞরা। ঝুঁকি এড়াতে মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল গ্যাসের নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করে। গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
এর আগে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট খাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য মাটি খোঁড়ার সময় গ্যাসের নির্গমন শুরু হয়। গর্ত থেকে গন্ধযুক্ত গ্যাস বের হওয়ার পরপরই সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর থেকে আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলপ্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তিনি ধারণা করেন, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। ভূগর্ভের ফাটল কিংবা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে।
এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হওয়ার পর উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লাগতে পারে।
আগুনের শিখার রং ও ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের আগে গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে ভূগর্ভে কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, সে বিষয়েও এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করা বা চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। এতে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। কিন্তু গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্স ও পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবহিত করা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে রাখতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিস্থিতির প্রয়োজনে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাসের নির্গমন ও আগুন জ্বলতে থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। গ্যাসের প্রকৃতি, নির্গমনের উৎস এবং আগুন নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণে নমুনা বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

