

মো: মোকাররম হোসাইন, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় গরু চুরির একটি মামলায় পুনট ইউনিয়নের দেওগ্রামের বাসিন্দা ফিরোজ আহম্মেদ মন্ডল (৪৭) কে গত শনিবার (১১ এপ্রিল) ভোর রাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি একই এলাকার মৃত মোহাতাব আলীর ছেলে এবং পুনট ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি।
ফিরোজ আহম্মেদ মন্ডলের গ্রেপ্তারের পর পুরো এলাকায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয় ও ক্ষোভ যেন একসঙ্গে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এতদিন তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। তবে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে।
এলাকাবাসীর দাবি, ফিরোজ কেবল একটি গরু চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বরং দীর্ঘদিন ধরে চুরি, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের নিয়ন্ত্রক হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ নভেম্বর বেগুনগ্রামের এক গৃহবধূর গোয়ালঘর থেকে তিনটি গরু চুরির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে আগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে ফিরোজের নাম উঠে আসে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গর্ভবতী গাভী আসামিরা শিবগঞ্জের একটি পরিত্যক্ত পাম্পে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখে এবং পরে বগুড়ার সোনাতলার ডাকুমারা হাটে ৬৮ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। বিক্রির টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সময় ফিরোজ আহম্মেদ মন্ডলকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতেই গত শনিবার ভোররাতে দেওগ্রাম নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং শনিবার দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়।
এদিকে গ্রেপ্তারের পর দেওগ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ফিরোজের নেতৃত্বে একটি সক্রিয় চোরচক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিভিন্ন স্থানে চুরি সংঘটিত করতো। শুধু গরু নয়, ধান, কৃষিপণ্য, এমনকি নলকূপ ও সেচ যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনাতেও তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। অনেকেই বলেন, চুরি করা মালামাল দ্রুত অন্য এলাকায় পাচার করার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক ছিল, যেখানে ফিরোজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
একই সঙ্গে মাদক কারবার নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের ছোট ছোট চালান সরবরাহে তিনি ‘ডিলার’ হিসেবে কাজ করতেন এবং তরুণদের একটি অংশকে এই চক্রে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, মাদক আর চুরির টাকায় তার প্রভাব তৈরি হয়েছিল। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই হুমকি আসত, ভয় দেখানো হতো।
চাঁদাবাজির বিষয়েও স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকরা জানান, বিভিন্ন অজুহাতে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেওয়া হতো। কেউ দিতে না চাইলে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও মারধর করা, ভয় দেখানো বা সামাজিকভাবে চাপে রাখার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় এক ধরনের নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছিল, যা কেউ প্রকাশ্যে বলতে সাহস পেত না।
এ বিষয়ে কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, গরু চুরির মামলায় পূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের তথ্য ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ফিরোজ আহম্মেদকে গ্রেপ্তার করে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অতিরিক্ত অভিযোগ উঠছে, সেগুলোও গুরুত্ব সহকারে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কালাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন মন্ডল বলেন, ফিরোজের বিরুদ্ধে ওঠা চুরি ও মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে দল তার দায় নেবে না। বিএনপির নাম ব্যবহার করে কোনো অপরাধ বরদাশত করা হবে না, তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

