

সরকারের কোনো প্রটোকল না মেনে ওষুধ বিক্রেতাদের ওষুধ বিক্রি করায় জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক এখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এর উপরে চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে মানুষ হাসপাতালে বিভিন্ন ব্যাকটিরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন- এমন তথ্য সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহারে ব্যাকটেরিয়া ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে এবং আইসিইউতে রোগীর মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তির সময় ব্যাকটেরিয়া মুক্ত থাকলেও তাদের অর্ধেকেরও বেশি রোগী আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ও সংক্রামিত হয়েছেন।
চিকিত্সকরা বলছেন, আইসিইউতে রোগীর স্বজনদের আনাগোনা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঠিকমতো না করায় রোগী সংক্রামিত হচ্ছেন। চিকিৎসকের অনুমতি সাপেক্ষে স্বাস্থ্য প্রটোকল মেনে আইসিইউ প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু রোগীর লোকজন সেসব নিয়ম না মেনে সহজেই আইসিইউতে ঢুকে পড়ে। এইসব কারণে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অনেক রোগী পরবর্তীতে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রামিত হয়েছেন।
শেরে বাংলা নগর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরিচালক প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাইরের লোক যখন-তখন আইসিইউতে প্রবেশ করলে তাদের দ্বারা চিকিৎসাধীন রোগীরা নানা ধরনের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়া আশঙ্কা বেশি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটে।’ এক শ্রেণীর অশিক্ষিত ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা কোনো ধরনের প্রটোকল না মেনে যখন তখন আইসিইউতে প্রবেশ করেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বহিরাগতরা যখন তখন আইসিইউতে নানা ধরনের জীবাণু নিয়ে প্রবেশ করছে। এতে মৃত্যু ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।’
আইসিডিডিআর,বি বিজ্ঞানী ডা. গাজী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মামুন বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত বিক্রি না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে আইসিইউর ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে দর্শনার্থীকে অবস্থান করার পরামর্শ দেন।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘ভুয়া চিকিত্সকরা দেদারসে রোগীকে দেদারসে অ্যান্টিবায়োটিক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে দিয়ে আসছে। যে লোক ওষুধ বিক্রি করছে সিংহভাগে ফার্মাসিস্ট নয়। রাজধানী ভাড়া মহল্লায় ওষুধের দোকান থেকে শুরু করে গ্রাম অঞ্চলের বেশিরভাগ ওষুধের দোকানে কোন শিক্ষিত ফার্মাসিস্ট নেই। ওইসব দোকানে সর্দি জ্বর কাশি সাধারণ ব্যথা নিয়ে গেলে রোগীকে একাধিক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকসহ নানা ধরনের ওষুধ দিয়ে থাকে। এই সকল ওষুধ খেয়ে রোগী সাময়িক ভালো হলেও দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। পরবর্তীতে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আর কাজ করে না বলে তিনি জানান।
তার মতে, কালচার সেনসিভিটি পরীক্ষা করার ফলাফল অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পরামর্শ দেন। এই প্রটোকল না মেনে অ্যান্টিবায়োটিক রোগীকে দিলে চোখের সামনে রোগীর মৃত্যু হওয়া আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ও বিক্রি করতে কঠোর মনিটরিং ও শাস্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানান, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ে আইসিডিআরবিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে ইতিমধ্যে বৈঠক করবেন। যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও বিক্রি ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে বলে মন্ত্রী জানান।

