

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাটের কচুয়ায় আলোচিত একই পরিবারের দুই নারীসহ তিনজনকে হত্যার রহস্য এক মাস পর উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পরকীয়া সম্পর্ক ফাঁস হওয়া এবং তা নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে ওই তিনজনকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, কচুয়া উপজেলার রাঢ়িপাড়া ইউনিয়নের চান্দেরখোলা গ্রামের মজিদ হাওলাদারের ছেলে জাহিদুল ইসলাম (৪০), একই গ্রামের সুলতান শেখের ছেলে আসাদুল শেখ (৪১) এবং বারিক হাওলাদারের ছেলে মো. আরিফ হাওলাদার ওরফে বাবু (৩৮)। তাঁরা পরস্পরের প্রতিবেশী ও আত্মীয়।
রবিবার (০৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাগেরহাট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, গত ২ আগস্ট রাতে কচুয়া উপজেলার রাঢ়িপাড়া ইউনিয়নের চান্দেরখোলা গ্রামে নিজ বাড়িতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মনিরা বেগম মনি (৬০), তাঁর ছেলে আহাদ আলী হাওলাদার (২৫) এবং মনিরার শাশুড়ি রাশিদা বেগম (৯৩)। ঘটনার দুই দিন পর ৪ আগস্ট ওই বাড়ি থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহত মনিরা বেগমের বড় ছেলে ফয়সাল হাওলাদার বাদী হয়ে পরদিন কচুয়া থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই সন্দেহভাজন হিসেবে জাহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি। পরে প্রযুক্তিগত তদন্ত ও স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জাহিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হয় পুলিশ। তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, তদন্তের একপর্যায়ে নিহত মনিরা বেগমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি অন্য কেউ ব্যবহার করছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। ওই সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে আসাদুল শেখ ও আরিফ হাওলাদার ওরফে বাবুকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে পুলিশ।
শনিবার কচুয়ায় দিনভর অভিযান চালিয়ে আরিফ হাওলাদার ওরফে বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আসাদুল শেখের বাড়ি থেকে নিহত আহাদ আলী হাওলাদারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে মোট চারটি মোবাইল ফোন ও একটি চার্জার উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জাহিদ, আসাদুল ও বাবু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। জাহিদ প্রথমে হাতুড়ি দিয়ে আহাদকে আঘাত করেন। পরে মনিরা বেগম ও রাশিদা বেগমকে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে আসাদুল ও বাবু জাহিদকে সহযোগিতা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর ওই বাড়ি থেকে তিন থেকে চারটি মোবাইল ফোন নিয়ে যান আসামিরা। আসাদুল ও বাবু জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলেও দাবি করেছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, নিহত আহাদের পরিবারের এক নারী সদস্যের সঙ্গে জাহিদের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। ওই নারী ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। জাহিদের সঙ্গে তাঁর মোবাইল ফোনে কথোপকথন ও বিভিন্ন টেক্সট ম্যাসেজ জাহিদের স্ত্রী দেখতে পাওয়ার পর তাঁদের সংসারে অশান্তি শুরু হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর নিহত মনিরা বেগমের সঙ্গে জাহিদের বাকবিতণ্ডা হয়। একই বিষয়কে কেন্দ্র করে জাহিদের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর সম্পর্কেও চরম বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে জাহিদ তাঁর আত্মীয় আসাদুল ও বাবুকে সঙ্গে নিয়ে আহাদদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেপ্তার তিনজনই পরস্পরের আত্মীয় এবং সম্পর্কে চাচাতো ভাই। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো বিষয় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

