

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাট পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। ২০২১ সালের জুনে নির্মাণ কাজ শেষে কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ ভৈরব নদীর পানি পরিশোধন করে ঐতিহ্যবাহী পচা দিঘিতে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর পচা দিঘি থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর বছরের পর বছর ধরে তীব্র পানি সংকটের মধ্যে রয়েছে পৌরবাসি। এখন এই পানি সরবরাহ জলাধার পচা দিঘিটি ইজারা দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই দিন ধরে দিঘিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার উৎসব হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজারেরও বেশি সৌখিন মাছ শিকারি অংশ নেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল পচা দিঘিটির চারপাশে ১০৮টি ঘাটে মাছ শিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘাটের জন্য নেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে আয় হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সৌখিন মাছ শিকারিরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বড়শি ফেলে মাছ ধরেন। আয়োজকদের দাবি, দুই দিনে শত মণেরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করা হয়েছে। মাছ ধরার সময় কেমিক্যালযুক্ত টোপ ও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ব্যবহারের কারণে দিঘির পানি দূষিত হচ্ছে। এতে পানিতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মাছ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। মাছ ধরার পর দিঘির পানিতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত দুর্গন্ধ থাকে বলেও অভিযোগ তাদের। এতে দিঘির চারপাশে বসবাসকারী মানুষ রান্না, গোসলসহ দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহার করতে সমস্যায় পড়ছেন। দিঘির পানিতে পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, পানির বোতল, ওয়ানটাইম প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছ শিকারের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন কেমিক্যাল ও খাদ্যদ্রব্য পানিতে মিশে দিঘির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান বলেন, আমরা এই পানি দিয়ে রান্না, গোসলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি। দিঘির চারপাশে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সময় বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। আগে এই পানি মানুষ পান করত। এখন কোনোভাবেই এই পানি খাওয়ার উপযোগী নেই। বাগেরহাট পৌরসভায় এমনিতেই তীব্র পানির সংকট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো দিঘিটি ইজারা দিয়ে মাছ ধরার মাধ্যমে রাজস্ব নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমন শেখ বলেন, আগে আমরা এই দিঘির পানি ব্যবহার করতাম। শহরের মানুষের পানির কষ্ট দূর করার জন্য পচা দিঘিটি দুই দফায় খনন করা হয়েছিল। এরশাদের আমলে একবার এবং পরে খালেদা জিয়ার আমলে আরেকবার খনন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শহরের মানুষের পানির সংকট দূর করা। কিন্তু সেই পানি এখন শহরের মানুষ পাচ্ছে না। অনেককে দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। পৌরসভার খামখেয়ালিতে সরকারের ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি পরিত্যক্ত হবার পর প্রভাবশালীরা এখন এখানে মাছ চাষ করছে। তারা মাছ চাষ করে লাভবান হলেও আমরা পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তা দেখার কেউ নেই।
বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট পৌরসভার জন্য পানি সরবরাহ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদ থেকে চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচা দিঘিতে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা ও আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পানি পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের কথা ছিল। ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষে কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর বাগেরহাট পৌরসভা আর সেটিকে সচল রাখেনি। ফলে বিশাল ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে বসেছে। বিভিন্ন যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
পচা দিঘিটির ইজারা নেয়া মৎস্যজীবী লীগের নেতা আলমগীর হোসেন বলেন, আমি দিঘিটি ইজারা নিয়ে মাছের চাষ করছি। দিঘিতে মাছের জন্য যে খাবার উপকারী, সেটিই ব্যবহার করা হয়। এতে পানির কোনো ক্ষতি হয় না, বরং পানির উপকার হয়।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের পর কেন পৌরসভা পানি সরবরাহ সচল রাখেনি তা ওই সময়ের কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে। বাগেরহাট শহরের সুপেয় পানির অভাব দূর করা এখন সময়ের দাবি। পচা দিঘির লিজের মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করতে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। এই দিধির পানি খাবার যোগ্য হিসেবে সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

